প্রকাশ : ০৯ এপ্রিল ২০২৬, ১৯:২৫
মধ্য রাতে আগুনে পুড়লো ছয় পরিবারের ভবিষ্যৎ
ফরিদগঞ্জের কালির বাজারে অগ্নিকাণ্ড

রাতটা ছিলো অন্যসব দিনের মতোই। দোকান গুটিয়ে তালা ঝুলিয়ে বাড়ি ফিরেছিলেন। তাদের মাথায় ছিলো পরদিনের হিসাব, নতুন পণ্যের চিন্তা, সংসারের টানাপোড়েন। কিন্তু কে জানতো, সেই রাতই তাদের জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর অধ্যায় হয়ে অপেক্ষা করছে!
|আরো খবর
মধ্যরাতের নিস্তব্ধতা ভেঙ্গে হঠাৎই ছড়িয়ে পড়ে আগুনের লেলিহান শিখা। মুহূর্তেই কালির বাজার পরিণত হয় আগুনের এক দাউদাউ অগ্নিগহ্বরে। আগুন যেন শুধু দোকানই পোড়ায়নি—পুড়িয়ে দিয়েছে ছয়টি পরিবারের স্বপ্ন, ভরসা আর জীবিকার শেষ সম্বল।
বুধবার (৮ এপ্রিল ২০২৬) গভীর রাতে ফরিদগঞ্জের ১৪ নম্বর দক্ষিণ ইউনিয়নের কালির বাজারে ঘটে এই হৃদয়বিদারক অগ্নিকাণ্ড।
খবর পেয়ে ছুটে আসেন ব্যবসায়ীরা। কিন্তু এসে দেখেন, যেখানে ছিলো তাদের দিনের পর দিন গড়ে তোলা দোকান, সেখানে এখন শুধু ধোঁয়া আর ছাই। কারো চোখে পানি, কারো মুখে নির্বাক হতাশা।
লেপ-তোষকের দোকানের মালিক আবুল কালাম ছাইয়ের স্তূপে বসে কাঁদছিলেন। কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে তার,
“এই দোকানটাই ছিলো আমার সব। ঋণ করে মাল তুলেছিলাম। এখন আমি কীভাবে ঘুরে দাঁড়াবো?” কসমেটিকস ব্যবসায়ী কিরণ চন্দ্র দাসের চোখে যেন শূন্যতা—৩০ বছর ধরে এই বাজারে আছি। এমন অসহায় কখনো হইনি। এক রাতেই সব শেষ...
ফলের দোকানি মিঠু মাথায় হাত দিয়ে বসে ছিলেন। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট ছেলেটি কিছুই বুঝতে না পেরে শুধু বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। এ দৃশ্য যেন আরো ভারী করে তোলে বাতাস।
থাই দোকানের শরীফ আহমেদ, কনফেকশনারী ব্যবসায়ী আনোয়ার, আর গার্মেন্টস ও জুতার দোকানি মহসীন পাটওয়ারী সবাই একই কাতারে দাঁড়িয়ে। কারো চোখে পানি, কারো চোখে অজানা ভবিষ্যতের ভয়।
তাদের দাবি, অন্তত অর্ধ কোটি টাকার মালামাল পুড়ে গেছে। স্থানীয়রা আগুন নেভাতে ছুটে এলেও ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে যায়। পরে ফায়ার সার্ভিস এসে প্রায় এক ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। কিন্তু আগুন থামলেও ক্ষতির আগুন যেন এখনো জ্বলছে ক্ষতিগ্রস্তদের বুকের ভেতর।
কালির বাজার ব্যবসায়ী কমিটির সদস্য জাকির খান ক্ষোভ আর আতঙ্ক মিশ্রিত কণ্ঠে বলেন, এটা নতুন কিছু না। বারবার আগুন লাগে। গত ১০ বছরে ৮-১০ বার এমন ঘটনা ঘটেছে। আমরা কি তাহলে আগুনের ভয়ে ব্যবসা করবো? তিনি আরও বলেন, অনেক ব্যবসায়ী এখন এই বাজার ছেড়ে চলে যাওয়ার চিন্তা করছেন। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, কোথায় যাবেন তারা? কী দিয়ে আবার শুরু করবেন?
ফায়ার সার্ভিসের প্রাথমিক ধারণা, বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকেই আগুনের সূত্রপাত। তবে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্যে এই ব্যাখ্যা যেন কোনো সান্ত্বনা নয়। তাদের একটাই প্রশ্ন “আমাদের ক্ষতি পুষিয়ে দেবে কে?” আজ কালির বাজারে গেলে দেখা যায়—আগুন নিভে গেছে, কিন্তু ছাইয়ের স্তূপের পাশে দাঁড়িয়ে আছে কিছু মানুষ, যারা এখনো বিশ্বাস করতে পারছেন না—
তাদের জীবনটা সত্যিই এভাবে পুড়ে গেছে।








